ছাত্র জানে, ছাত্রী জানে, আভিভাবক জানেন, রাজ্যবাসী মাত্রই জানেন, নম্বর যতই হোক, ইউনিয়ন দাদা দিদিদের টাকা না দিতে পারলে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কলেজে ঠাই মিলবে না। ৫০০০ থেকে শুরু করে ৬৫০০০ – ৭০০০০ পর্যন্ত দর উঠছে আসনের। শিক্ষামন্ত্রী এবং তাঁর সহকর্মীরাই একমাত্র জানেননা কলেজ ভর্তির নামে কি প্রহসন চলছে এই রাজ্যে।
অথবা জেনেও চোখ বন্ধ রেখেছেন এবং প্রশ্রয় দিচ্ছেন এই দুর্নীতিকে। কারন রাজ্যের ৯৯% কলেজ ইউনিয়নই শাসক দলের কব্জায়। পশ্চিমবঙ্গে সিট সিন্ডিকেটের শুরু ২০১১ তে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর। ইউনিওনের দাপটে অনলাইনে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়েও পিছিয়ে আসতে হয়, এবং পদ হারাতে হয় তৃনমূল সরকারের প্রথম শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে। অধ্যাপক ও নাটককর্মী ব্রাত্য বসু চেয়েছিলেন অনলাইনে
ভর্তি, প্রাথমিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সায়ও ছিল তাতে। কিন্তু ছাত্র সংগঠনের আবদারের অনেক জোর, পদ হারালেন ব্রাত্যবাবু। শিক্ষামন্ত্রী হলেন মুখ্যমন্ত্রীর আস্থাভাজন অনুগত পার্থ চট্টোপাধ্যায় ।
১০০% পার্টিজান পার্থবাবু মুখে অনেকবার অনলাইনে ভর্তি এবং সিট সিন্ডিকেট নিয়ে তোপ দেগেছেন, কাজ কিছুই হয়নি। বরং বছর বছর ইউনিয়নের খাঁই বেড়েছে। শিল্প নেই, চাকরি নেই, সিট সিন্ডিকেট হয়ে উঠেছে রোজগারের উপায়।
নম্বর আছে, কলেজের লিস্টে নামও তবু ভর্তি হতে পারছেনা ছাত্র ছাত্রীরা। যথেষ্ট নম্বর থাকলেও টাকার জোর না থাকলে দেখতে হচ্ছে দাদা দিদিদের খুশী করে পছন্দের বিষয়ে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে অনেক কম নম্বর পাওয়া ছাত্র ছাত্রীরা। ২০১৭ সালে এই কারনেই আত্মহত্যা করে উত্তর ২৪ পরগনার ছাত্রী চৈতালি পাত্র। মেধা তালিকায় নাম ওঠা সত্তেও সতের হাজার টাকা চায় ইউনিয়নের এক দাদা। ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি চৈতালির বাবার ক্ষমতা ছিলনা অত টাকা দেওয়ার। চৈতালি বিষ খায়। একই ভাবে ২০১৬ সালেও মারা গিয়েছিল কলকাতার আরেক ছাত্রী।
কলকাতার নামকরা কলেজ মৌলানা আজাদ কলেজ। ভূগোলে মেধা তালিকায় ৪০০র নিচে নাম রয়েছে এক ছাত্রর। ইউনিয়নের দাদা ভরসা দিলেন, “কোনো চিন্তা নেই, ৮০০০০ হাজার দিলেই ভর্তি নিশ্চিত। আশুতোষ কলেজে স্টাটিস্টিক্সে আসন বিক্রি হচ্ছে ৬৫০০০ এ। ছাত্রকর্মী সমন্বয় রাহা ও তাঁর কায়েকজন বন্ধু মিলে এক্তা ছাত্রদের সাহায্যে হেল্পলাইন খুলেছিলেন, পিছনে রয়েছে এসএফআই।”
এসএফআই রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য জানালেন, “প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিয়ে গুটি কয়েক কলেজে স্বচ্ছ ভাবে মেধা অনুযায়ী ভর্তি চলছে। বাকি সব জায়গাতেই চলছে প্রকাশ্যে সিট বিক্রি।” রোজ ফোন আসছে তাদের কাছে, কিন্তু প্রকাশ্যে আসার কথা বললেই পিছিয়ে যাচ্ছে অভিযোগকারীরা। ভর্তি বড় বালাই। ফলে সব জেনেও রমরমিয়ে চলছে সিট সিন্ডিকেট।
ব্যতিক্রম যে নেই তাও নয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও ১০০% ভর্তি হচ্ছে পরীক্ষা ও মেধা তালিকা অনুযায়ী। শিক্ষামন্ত্রীর আবার তা না-পসান্দ। পরীক্ষা উঠিয়ে দিতে চেয়েও এ যাত্রায় ছাত্রদের প্রতিবাদে পিছু হটতে হয়েছে তাঁকে। বাস্তবে যেখানে অধ্যাপকরা রুখে দাঁড়াচ্ছেন, এবং কলেজ অধ্যক্ষর সদিচ্ছা আছে, সেখানে স্বাভাবিক নিয়মেই ভর্তি হতে পারছে ছাত্র ছাত্রীরা। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক ডায়মন্ড হারবার ফকিরচাঁদ কলেজের এক অধ্যাপক জানালেন, “চাপ রয়েছে, আমাদের ছাত্র ইউনিয়ন হুমকিও দিচ্ছে, কিন্তু আমরা নিজে দাঁড়িয়ে
থেকে ভর্তি করাচ্ছি।”
— Kolkata Police (@KolkataPolice) June 30, 2018

রাজ্য জুড়ে সিট কেনাবেচা নিয়ে সোরগোলের জেরে কিছুটা হলেও চাপে প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী দুজনেই বলছেন এই বরদাস্ত করা হবে না। শুক্রবার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে কলকাতার শ্রীশচন্দ্র কলেজে দুই তৃনমূল ছাত্র পরিষদের নেতাকে। কলকাতার বেশ কয়েকটা কলেজে দেখা গেল লাউডস্পিকারে সতর্ক করা হচ্ছে প্ররোচনায় কান না দেওয়ার জন্য। নিনুকেরা বলছে এ সবই লোক
দেখানো, ‘টু লিটল, টু লেট’।