হয়ত বুঝেছিল। হয়ত বোঝানো হয়েছিল। ভাষা মানে ধর্ম। উর্দু মানে মুসলমান। বাংলা মানে হিন্দু। হয়ত স্লোগান তুলেছিল গো ব্যাক উর্দু। হয়ত মাথায় বিষ দিয়েছিল। চেতনায় দিয়েছিল এককহীন ঘৃণা। হয়ত কেউ বলেনি ভাষার কোন দেশ নেই। ভাষার কোন জাত নেই। ভাষা মেঘের মত। ভাষা ছায়ার মত। ভাষা মায়ের মত। মায়ের ভাষা মানে উর্দু। মায়ের ভাষা মানে বাংলা। মায়ের ভাষা মানে একুশে ফেব্রুয়ারি। মায়ের ভাষা মানে সালাম বরকত। মায়ের ভাষা মানে বরাক, শিলচর।
কিন্তু পরিণামে রক্ত? খুন? কে দায় নেবে? ছেলেটি হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসে যায় নি। কোন মেয়ের মুখে অ্যাসিড ছোঁড়ে নি। জঙ্গল থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে নি। শুধু বাংলা মাধ্যমে শিক্ষকের দাবীতে আন্দোলনে ছিল। তাতেই তাকে মরতে হল ? কে দায় নেবে এই হত্যার? আন্দোলন, প্ররোচনা সমস্ত কিছু জানার পরেও তিন দিন ধরে চলা এই আগুন কেন নেভানো গেল না? কেন নেতা, মন্ত্রী, সরকারী আমলা কোমলমতী ছাত্রছাত্রীদের বোঝালেন না, কেন নির্দিষ্ট সময়ে সমস্যার সমাধান করলেন না? কেন বললেন না দশজন উর্দু ছাত্রছাত্রীরও অধিকার আছে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের। কেন কেউ অভিভাবকদের বোঝালেন না বাংলা মাধ্যমে পর্যাপ্ত শিক্ষক দেওয়া হব। কিছুই করলেন না মন্ত্রীসাহেব। খুব সহজেই পুলিশ দিয়ে আন্দোলন থামানোর নামে গুলি চালিয়ে দিলেন নির্বিচারে।
Also read: গুলিবিদ্ধ দুই ছাত্রের মৃত্যুতে উত্তাল উত্তর দিনাজপুর, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী আপনি ঠিক কী পারেন বলুন তো? খোঁজ নিয়েছেন কোন যাদু বলে, এস সি পোস্টে এস টি শিক্ষক, সাধারণ পোস্টে এস. টি শিক্ষক নিয়োগ করেছেন? লাগাতার দশদিন ফোন করেছিল সোনারপুরের মেয়েটি। শেষে সে জানল যে বিদ্যালয়ে এস টি পোস্ট নেই। পূর্ব মেদিনীপুর থেকে স্কুলে এসে জানতে পেরেছে পোস্ট নেই। ঠিক এই অপরিণামদর্শিতার জন্য মনিভিটায় ছাত্র আন্দোলন, দাঁড়িভিটে ছাত্র আন্দোলন।
আর সেই পিছনে লুকিয়ে থাকা খেলোয়াড়েরা, নিহত ছেলেটি কি আপনাদের পরিবারের? গুলিবিদ্ধ সন্তানেরা কি আপনাদের পরিবারের? নিশ্চিতভাবে নয়। কেন এমন আগুন দিলেন? কেন বললেন উর্দু মানেই হিন্দু বিপন্ন। কেন ভাবলেন বাংলা মানেই হিন্দু? তিন দিন ধরে উর্দু চালু করার জন্য কেউ নেতা মন্ত্রী, ডি. আই এর কাছে দরবার করলেন, কেউ উর্দু বন্ধ করে বাংলার দাবীতে অঙ্ক মেলালেন। কেন নিজেরা বসলেন না কোন গাছের নীচে। কেন সহজিয়া পথে মেটালেন না সমস্যা? বিষ ছড়িয়ে দিলেন। ফাঁদ পাতলেন। এই হত্যার দায় আপনাদের।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক, আপনারা নিজের ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না? এরপরে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে মনে হবে না আপনাদের, আপনাদের ব্যর্থতার জন্য, শুধু আপনাদের ব্যর্থতার জন্য একটি ছাত্রের লাশ? নিজেদের দেখে লজ্জিত হবেন না?
বাংলা রাজ্যের সুশীলদের কিছু বলতে নেই। কারণ বিকারগ্রস্ত। বিকার চাপলে মাঠে নামেন। প্রভু আজ্ঞা দিলে শেয়ালের মত চিৎকার করেন। একসময় এই সমাজ নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরের প্রতিবাদে অ্যাকাডেমি, নাট্য অ্যাকাডেমি, ইত্যাদি কমিটি ছেড়ে এসেছিলেন। এখন তারা শৌচালয় কমিটিও ছাড়বেন না। কারণ গলায় বকলেশ। জনগণ নেশা করে ঘুমিয়ে গেছে। তাই যেমন খুশি চলেছেন রাজা। পারিষদকে বলছেন– ” আমি কত সুন্দর!” পারিষদ বলে-“আহা কত সুন্দর!” পুলিশ মন্ত্রী বিমান বন্দরে বলেছেন-“আগুন ঘণ্টা চারেকে নিভে যাবে তো পুলিশ?” টেবিল তলার পুলিশ বলেছে – “নিভে যাবে মালিক।” কিন্তু আগুন নেভেনি। আগুন এখন বাগড়ি থেকে উত্তর দিনাজপুরের দাঁড়িভিট।
যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়, তার প্রতি করুণা। যে শিক্ষক সন্তানসম ছাত্রের অকাল প্রয়াণে অশৌচ পালন করেন না, তার প্রতি কেবল ঘৃণা।
লাশ এখন এক থেকে দুই। রাজেশ সরকার থেকে তাপস বর্মণ।