মানুষ যত বড় হয় তার পৃথিবী তত বড় হয় আর কুয়োর ব্যাং যত বড় হয় তার কুয়ো তত ছোট হয়। আমরা কুয়োর ব্যাং, তাই নব্বইয়ের দশকে ভাবতাম কোথায় কোন মুলুকে কিউবা, সেখানে কার কি অসুবিধা তার জন্যে ভেবে চাঁদা দিতে যাব কেন? তারপর ভাবলাম কোথায় প্যালেস্তাইন, কোথায় সিরিয়া তাদের নিয়ে কোন উন্মাদরা মিছিল করে? খেয়েদেয়ে কোন কাজ নেই। এখন ঘরের পাশে মেডিকাল কলেজের ছেলেরা অনশন করছে, আর আমরা ভাবছি মরুক গে, আমাদের কী এসে যায়? আমরা তো আর সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হতে যাব না। আমাদের পয়সা আছে, তাই মেডিক্লেম আছে। ওটা আছে বলে আমাদের জন্যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বেসরকারী হাসপাতাল, নার্সিংহোম আছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা ডাক্তারি পড়তে গেলেও বাড়ি ভাড়া করে বা পেয়িং গেস্ট হয়ে যাতে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করার রেস্ত আমাদের আছে। সর্বোপরি বেসরকারী মেডিকাল কলেজ আছে। সেখানে ফেলো কড়ি মাখো তেল। হোস্টেল নিয়ে হাহাকারের প্রশ্নই নেই। সুতরাং মহাদেশের প্রাচীনতম মেডিকাল কলেজে কারা বহুদূর থেকে এসে হোস্টেল পাচ্ছে না, কাদের হোস্টেল না পেয়ে বাইরে থাকতে গিয়ে সংসারে টানাটানি পড়ে যাচ্ছে তাতে আমাদের ভারী বয়ে গেল। শাসক দল ছাত্রনেতাকে হোস্টেল সুপার বানিয়ে দিলেও আমাদের ঘন্টা।
সরকার জানে যে আমরা, মানে তথাকথিত শিক্ষিত এবং খাওয়াপরার অভাব না থাকা লোকেরা, এরকমটাই ভাবি। সেইজন্যেই নিশ্চিন্তে শহরজুড়ে শহীদ দিবসের নাম করে মোচ্ছব হচ্ছে অথচ দিন দশেক ধরে একটা ন্যায্য দাবী নিয়ে অনশন করে যে ছেলেগুলোর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে সরকার তাদের দিকে ফিরেও দেখছে না। ভোটবাক্সে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা না থাকলে কোন দাবীর দিকে সরকার ফিরেও দ্যাখে না। যাঁরা গরীব মানুষ, প্রান্তিক মানুষ তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াইটা এত শক্ত যে মেডিকাল কলেজের ছাত্র আন্দোলন তাঁদের অধিকাংশের কাছে অনেক দূরের জিনিস। কন্যাশ্রীর সাইকেল অনেক বেশি জরুরী। আর আমরা, যারা এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে পারি, তাদের নিজেদের স্বার্থের প্রতি আনুগত্য প্রশ্নাতীত। তাই মরলে মরুক না কিছু হবু ডাক্তার।

আর যা নিয়েই প্রশ্ন তুলুন, মুখ্যমন্ত্রীর আমাদের মন বোঝার ক্ষমতা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা চলে না। তিনি জানেন বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল ঠিক থাকলেই আমরা খুশি। বছরখানেক আগে ঝাঁ চকচকে হাসপাতালগুলোর মালিকদের ডেকে ধমকধামক দিয়ে তিনি আমাদের খুশ করে দিয়েছেন। তারপর তাঁর দলের নেতারা গিয়ে কয়েকটা হাসপাতালে কিছু ডাক্তার আর হাসপাতালের কর্মীর উপরে হাতের সুখ করে প্রমাণ করেছেন তাঁরা সাধারণ মানুষের জন্যে ভাবেন। মানুষের পাশে থাকার এই ইন্দ্রজাল আমাদের এমন সম্মোহিত করেছে যে আমাদেরই ট্যাক্সের টাকায় আমাদেরই জন্যে তৈরি যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সেটা উঠে যাওয়ার উপক্রম হলেও আমরা ভাবিত নই। আমরা এ-ও খেয়াল করছি না যে প্রকাশ্যে ধমক খাওয়ার পরে বেসরকারী হাসপাতালগুলোর বিল ম্যাজিকের মত কমে যায়নি কিন্তু। দিন যেমন যাওয়ার তেমনই যাচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে মারদাঙ্গা, চোখরাঙানির ফলে কিছু ব্যত্যয় ঘটছে মাত্র।
হবু ডাক্তাররা মরতে বসায় আমরা বোধহয় যৎপরোনাস্তি খুশিও। বেশ একটা “দ্যাখ কেমন লাগে” ভাব। ডাক্তারদের উপর আমাদের অনেকেরই অনেক রাগ। ফলে ডাক্তারদের দুর্দশায় আমাদের কিছুটা প্রতিশোধ স্পৃহাও চরিতার্থ হয়। এ কথাটাও স্নেহময়ী শাসক দিব্যি বোঝেন। নইলে গদিতে বসেই রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রাতারাতি উন্নতিকল্পে ঝটিকা সফরে গিয়ে বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজির অধিকর্তা ডাক্তার এস পি গড়াইকে সাসপেন্ড করতেন না। ২০১১ র সেই ঝটিকা সফরগুলোর নিট ফল এই যে কলকাতার সরকারী হাসপাতালগুলোয় এক পোঁচ করে নীল সাদা রং হয়েছে আর বেসরকারী হাসপাতালগুলোর মত দেখতে সদর দরজা হয়েছে। ও হ্যাঁ, সরকারী হাসপাতালে এখন মানুষের জন্যে বসানো মেশিনে পোষা কুকুরের ই সি জি হচ্ছে অবশ্য। কোন হাসপাতালে? শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালে, যেখানকার নিও নাটালজি বিভাগকে দেশের অন্যতম সেরা করে তোলা প্রবীণ বিভাগীয় প্রধান ডাক্তার অরুণ সিংকে বদলি করা হয়েছিল উত্তর ২৪ পরগণার এমন এক হাসপাতালে, যেখানে ঐ বিভাগটাই নেই।

ফেসবুকে অনশনরত ছাত্রদের একজন, অনিকেত, তার পোস্টে পড়ছি “রাত ৮ টার সময় প্রিন্সিপালের নির্দেশে প্রায় ৭০-৮০ জন পুলিশ ও উর্দিছাড়া গুন্ডা কলেজ ক্যাম্পাসে এসে মেডিক্যাল কলেজের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্লকের ভেতরে ঢোকে এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থানরত ছাত্রদের ওপর শুরু করে নির্মম অত্যাচার। একের পর এক চড়-ঘুঁষি-লাথি মারতে থাকে ছাত্রদের, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় প্রতিবন্ধী ছাত্রদের, উপস্থিত একজন ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি করতেও ছাড়েনি এই চটি-পুলিশের দল… প্রায় ২০ জন মেডিক্যাল পড়ুয়া আহত হন, যাদের মধ্যে ২ জন গুরুতর আহত। এরপর পুলিশ তৃণমূলের দালাল প্রিন্সিপালকে গাড়িতে নিয়ে চলে যায়।” পড়ছি আর ভাবছি, যে ব্যবস্থায় ডাক্তার পাড়ুই, ডাক্তার সিং এর জায়গা নেই, সেখানে উচ্ছল কুমারের মত অভদ্রই যে সর্বেসর্বা হবেন এবং কলেজটাকে লাটে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন, এতে আর আশ্চর্য কী? দায়ী আসলে আমরা, উদাসীন শিক্ষিতরা। কলকাতা মেডিকাল কলেজ আজ হঠাৎ এই অবস্থায় পৌঁছয়নি। স্বাস্থ্যের মত অপরিহার্য ক্ষেত্রে একের পর এক অন্যায় হয়ে চললেও আমরা তো অসন্তুষ্ট হইনি। সরকারের জনপ্রিয়তা তো বেড়েছে ক্রমশ। যেখানে নির্বাচনের দিন চড়াম চড়াম ঢাক বাজেনি সেখানেও বেড়েছে। ব্যক্তিপূজায় মজে থাকা সংবাদমাধ্যমও, যে উৎসাহ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে সফর দেখিয়েছিল সেই উৎসাহ নিয়ে বাঙ্গুরের উন্নতি বা অবনতি তো আমাদের দেখায়নি। যত ঘন্টা চ্যানেলে চ্যানেলে একুশে জুলাইয়ের মিটিঙে কতরকমের খাবারদাবারের ব্যবস্থা হয়েছে তা দেখানো হল কদিন ধরে, তার অর্ধেক সময়ও তো না খেয়ে, হুমকি এবং প্রলোভন জয় করে ঘাঁটি আগলে পড়ে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর মুখ দেখা গেল না টিভির পর্দায়। রাজ্যের সবচেয়ে বড় মেডিকাল কলেজের অচলাবস্থা অধিকাংশ খবরের কাগজের প্রথম পাতাও দখল করতে পারছে না। বোধ করি দু একটা প্রাণ নষ্ট না হলে খবরটা যথেষ্ট মুচমুচে হয়ে উঠবে না সম্পাদকদের চোখে।
আমাদের মত অর্বাচীনদের চেয়েও বেশি লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত অবশ্য রাখছেন সিনিয়র ডাক্তাররা। যাদবপুরে কদিন আগেই প্রবল সরকারবিরোধী আন্দোলন হল। সেখানে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ছাত্রছাত্রীদের পাশে সক্রিয়ভাবে ছিলেন। মেডিকাল কলেজে উলটপুরাণ। শুধুই প্রিন্সিপাল ডাক্তারটি নন, অন্যরাও বিশেষ সহানুভূতি দেখাচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। বাইরের প্রাক্তনীরা তবু অনেকে পাশে দাঁড়াচ্ছেন, নিদেনপক্ষে সোশাল মিডিয়ায় নিজেদের সমর্থন জানাচ্ছেন। বৃহত্তর চিকিৎসক সমাজের প্রতিক্রিয়াও গর্ব করে বলবার মত নয়। সরকারী চাকুরে ডাক্তাররা নাকি চাকরির দায়ে চুপ করে আছেন। অথচ দেড়শো কোটির দেশে সম্ভবত ডাক্তারিই একমাত্র পেশা যেখানে চাকরি না করলেও পথে বসতে হবে না। উপরন্তু অপ্রিয় সত্যটা এই যে যারা অনশন করছে তাদের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা অনেকেই বিলাসবহুল বেসরকারী চিকিৎসায় অংশগ্রহণ করে সরকারী চাকরির দ্বিগুণ বা তিনগুণ রোজগার করেন। এঁদেরও নাকি চাকরি হারানোর ভয়।
কদিন আগে যখন বেসরকারী হাসপাতালের ডাক্তারদের গায়ে হাত পড়ল তখন কলকাতার রাস্তায় সেই ডাক্তাররা মিছিলে বেরিয়েছিলেন। এঁরা অনেকেই এই রাজ্যের বিভিন্ন সরকারী মেডিকাল কলেজের প্রাক্তনী। সোশাল মিডিয়ায় ডাক্তাররা কর্পোরেটের সামনে কত অসহায় তা নিয়ে পোস্ট দিতে অক্লান্ত। অথচ নিজেদের পেশার জুনিয়রদের প্রতি এই সরকারী অন্যায়ের প্রতিবাদে এঁদের এখন অব্দি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কে জানে, হয়ত কর্পোরেটের সবুজ সংকেত না পেলে প্রতিবাদ করা যায় না। তাই ডেঙ্গুর মোকাবিলায় সরকারী ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরে গ্রেপ্তার হওয়া ডাক্তার অরুণাচল দত্ত চৌধুরীর পক্ষে যারা দাঁড়ায়নি তারা আজও চুপ।
আসলে একা ডাক্তার উচ্ছল ভদ্র তো নন, ক্ষমতাশালী (পড়ুন সরকার) অথবা বিত্তশালীর (পড়ুন কর্পোরেটের) নেকনজরে থেকে ফুলেফেঁপে ওঠার লোভ আমরা কে-ই বা সামলাতে পারি আজকাল? পূর্বপুরুষদের কত শতাব্দীর সুকৃতির ফলে কে জানে, আমাদেরই ঘরদোর থেকে অনিকেতরা এখনো বেরোচ্ছে। এরা এখনো ধান্দাবাজি শেখেনি, লাভের কড়ি বোঝেনি, ত্যাগ করতে পিছপা নয়, শুধু নিজের নয় অন্যদের ভাল, অন্যদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবে। কে বলেছে ওরা গত দশদিন না খেয়ে আধমরা? আধমরা তো আমরা। অক্ষম হৃদয়ে তাই ওদের উপরেই ভরসা রাখি, যদি ওরা পারে আমাদের এই আধমরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত সর্বনাশ থেকে বাঁচাতে। ওদেরই বলি “ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, / ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ / আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।“