কলেজের গেটের সামনে ফ্লেক্স টাঙিয়েছে পুলিশ। যেখানে বলা হয়েছে, ছাত্র ভর্তির করিয়ে দেওয়ার জন্য কেউ টাকা বা ঘুষ চাইলে যেন পুলিশে খবর দেওয়া হয়! অভিযোগকরারীর নাম-ধাম গোপন রেখেই সহায়তা করবে পুলিশ!
কলেজের ছাত্র সংসদের নেতাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পুলিশ ভ্যানে। না, কোনও দুর্বার আন্দোলনের জন্য নয়। ছাত্র ভর্তির নামে টাকা আদায়ের অভিযোগে!
শাসক দলের তরফে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে খাস কলকাতার কিছু কলেজের ছাত্র সংসদের ইউনিট। অভিভাবকদের ‘আস্থা’ ফেরানোর লক্ষ্যে কলেজে হাজির হয়ে যাচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। অভয় দিচ্ছেন, কেউ চাইলেও টাকা দেবেন না। আর বাইরে ক্যামেরার দিকে পিঠ করে ভুক্তভোগী ছাত্র বলছে, মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করে দেওয়ার পরেও স্নাতকে আসন পাইয়ে দেওয়ার জন্য কোথাও ৩০, কোথাও ৪০, কোথাও ৬০ হাজার টাকা দর হাঁকা হচ্ছে!
এ ছবি পশ্চিমবঙ্গে অচেনা, অদৃষ্টপূর্ব! কিন্তু তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) বদান্যতায় এ সবই এ বার চেনা ছবি হয়ে উঠল কলকাতায়। এবং রাজ্যের অন্যত্রও। পরিস্থিতি ঘোরতর এতটাই যে, পুলিশের বিজ্ঞপ্তিই স্বীকারোক্তি— কলেজে ভর্তির নামে ‘তোলা আদায়’ চলছে! কলেজের জন্য কাঠগড়ায় টিএমসিপি ঠিকই। কিন্তু শুধুই ‘ছোট’দের দোষ দেওয়া যায় কি? রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা এক বাক্যে বলছেন, ‘বড়‘দের কাছ থেকে যা দেখছে ‘ছোট’রা, তাতেই তারা অনুপ্রাণিত! মুখ্যমন্ত্রীই তো কয়েক বছর আগে ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘‘ছোট ছোট ছেলেরা একটু দুষ্টুমি করে!’’ তখন শিক্ষাঙ্গনের ক্যাম্পাসে একের পর এক হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে আসছিল। প্রথমে গুন্ডামিকে কড়া হাতে দমন করার বদলে প্রশ্রয় দিয়ে যে ‘অনুপ্রেরণা’র শুরু, তা-ই দ্রুত পথ দেখিয়েছে ‘তোলাবাজি’র। উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষায় ভাল ফল করে, কলেজের মেধা তালিকায় নাম তুলেও নিস্তার নেই। কলেজ ইউনিয়নের দাদাদের মোটা টাকা না দিলে পছন্দের বিষয়ে আসন মিলছে না!
আগে কংগ্রেস বা অন্য দল করতেন, এখন তৃণমূলে আছেন— এমন কিছু বিধায়কও ঘরোয়া আসরে মানছেন, ‘‘চিরকালই এর-ওর অনুরোধ নিয়ে কলেজে গিয়ে ছাত্র ভর্তি করিয়েছি। কখনও নিজেদের ইউনিয়নকে দিয়ে, কখনও আবার বিরোধী পক্ষের ইউনিয়নের কাউকে অনুরোধ করে। কিন্তু ভর্তি করিয়ে দেবে বলে কেউ এ ভাবে টাকা চাইছে, কোনও কালে এই জিনিস দেখিনি!’’ তাঁরা আরও স্বীকার করছেন, ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা নেওয়ার উপসর্গ গত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে। এ বার রোগ মহামারীর আকার নেওয়ায় হইচই হয়েছে বেশি। যাতে প্রমাণ মিলছে, দুর্নীতি এখন পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও ব্যবস্থার ঘাড়ে চেপে বসেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রও তার বাইরে নয়।
এই বাংলা গত কয়েক বছরে নেতা-মন্ত্রী-সাংসদদের হাত পেতে টাকা নেওয়ার ছবি গোপন ক্যামেরায় বন্দি হতে দেখেছে। ছবি সামনে আসার পরেও তার ‘সত্যতা’ নিয়ে শাসক দলের সর্বোচ্চ নেত্রীকে প্রশ্ন তুলতে দেখেছে। একই বিষয়ে তাঁর আবার বয়ান বদল দেখেছে। নিরীহ, গরিব মানুষের গচ্ছিত রাখা টাকা ভুঁইফোড় সংস্থার হাত ঘুরে শাসক দলের কেষ্ট-বিষ্টুদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগ শুনেছে। সিবিআই এসে কখনও কাউকে কাউকে গ্রেফতার করেছে, আবার তদন্ত তলিয়ে গিয়েছে বিশ বাঁও জলে। সারদার মতো বড় ঘটনা ছাড়াও রাজ্য জুড়ে অজস্র ছোট ছোট অর্থলগ্নি সংস্থার নামে একই রকম লুঠ হয়েছে। আবার শহর-গ্রামের স্থানীয় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে দুর্নীতির জাল কী ভাবে তাঁদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, ভুক্তভোগী মানুষের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে তার বিবরণ পাওয়া গিয়েছে।
প্রতিবাদ? তার মোক্ষম অস্ত্রটি, যার নাম ভোট, ভোঁতা করে দেওয়া হয়েছে একের পর এক ‘প্রহসন’ আয়োজন করে। ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছে শাসক দল। বিরোধী নেতা, শাসক দলের কিছু ‘বীতশ্রদ্ধ’ মুখ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে তাই মনে করছেন— বাংলায় এখন ঘোর অন্ধকার!
ভর্তি-চক্রের প্রসঙ্গেই অতীতের ছাত্র আন্দোলনের দাপুটে নেতা এবং সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ষীয়ান সদস্য শ্যামল চক্রবর্তীর মত, ‘‘সারদা-নারদে দাদাদের টাকা নিতে দেখেছে ছোটরা। দেখাদেখি তারাও তা-ই করছে! কোথায় নীতি, কোথায় আদর্শ?’’ অতীতের আর এক ছাত্র নেতা এবং অধুনা রাজ্যের মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘‘আমাদের সময়ে একটা আদর্শের ভিত্তিতে যে কোনও রাজনীতি হত। রাজনৈতিক ভাবে কেউ কারও বিরোধী হলেও দু’পক্ষেরই কিছু আদর্শ থাকত। এখন একটা সার্বিক অবক্ষয়।’’
অন্ধকারের গ্রাস থেকে মুক্তি কবে, তার উত্তর আপাতত নিখোঁজ!
The author is a journalist working in a leading publication.